পর্যালোচনা

ইউরোপকে ধ্বংস করছে আমেরিকা

আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপ

এই বিশ্লেষণটি এরিক জুসের ৮ই আগস্টে গ্লোবাল রিসার্চ এ প্রকাশিত হওয়া ‘ইউ.এস. ইজ ডেস্ট্রইং ইউরোপ’র বাংলা অনুবাদ।
এবং এই লেখাটি অনুবাদ করেছে:
মেহেরুন নাহার রিমি

 

ইউরোপের পরিধির ভেতরের দেশগুলো বিশেষ করে সীমান্তের লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইউক্রেইনের মত দেশগুলোতে আমারিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যুদ্ধবিমান ও সামরিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে একধরনের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করছে, যার ফলশ্রুতিতে অসংখ্য উদ্বাস্তু জনগণ তৈরী হচ্ছে এবং স্বদেশে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ তাদের অন্যদেশে বা অন্যভূখন্ডে প্রবেশে বাধ্য করছে । আমেরিকার এই মধ্যপ্রাচ্যের আগুনে বাতাস দেওয়ার কারনে শুধু যে ইউরোপের প্রান্তীয় অঞ্চলে( যেমন লিবিয়া, সিরিয়া ) রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে তা নয় এর প্রভাব সুদূর উত্তর ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে ।

২০১৫ সালে ৩রা আগস্টে গার্ডিয়ানে সামুজ কুকের একটা লেখার হেডিং ছিল এমন , " সিরিয়ায় ওবামার নিরাপদ অঞ্চল তৈরী করার উদ্দেশ্য হলো দেশটিকে আরেকটি নতুন লিবিয়ায় রূপান্তর করা "। এবং সে রিপোর্ট করেছে যে, ইতোপূর্বেই ওবামা সরকার সিরিয়ার উপর তুরস্কের নো ফ্লাই জোন সৃষ্টিতে আমেরিকান বিমান সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে । এখন আমেরিকা-তুরস্ক জোট সিরিয়ান প্রেসিডেন্ট আসাদ আল বাশারের যুদ্ধ-বিমানগুলো পরিকল্পনা করে ধ্বংস করে দেবে যেগুলো সিরিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া ইসলামিক স্টেইট সহ চরমপন্হী ইসলামিক সংগঠনগুলো বিরুদ্ধে আক্রমন চালাচ্ছিল ।

কুক আরও জানায় - সিরিয়ার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তুরস্ক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামার কাছ থেকে এই নো ফ্লাই জোন করার জন্য দাবি জানিয়ে আসছে। এবং হঠাৎ করেই তুরস্ক ঠিক যেখানটাতে চেয়েছে সেখানেই নো ফ্লাই জোন সৃষ্টি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে । সুতরাং তুরস্কের চাওয়া এই জোনের আসল নাম যেটা হওয়া উচিত ছিল, “কুর্দি ও সিরিয়ান সরকার বিরোধী নিরাপদ অঞ্চল” আর সেটা না রেখে তার নাম ছলনা করে রাখা হয়েছে ইসলামিক স্টেইট বিরোধী নিরাপদ অঞ্চল যাতে বিশ্ববাসীকে ধোঁকা দেয়া সহজ হয়।

গত মাসে অর্থাত জুলাই এর ২৭ তারিখে নিউইয়র্ক টাইম্স-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, এই পরিকল্পনাটি আসলে, আমেরিকা ও তুরস্কের বিমান সহায়তা নিয়ে সিরিয়ার অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থী বিদ্রোহীদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ডাক দেয় । যদিও টাইমস বরাবরের মতই তাদের আমেরিকান সরকারের জন্যে একের পর এক রিপোর্ট করে চলেছে কিন্তু "অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্হী" দের প্রকৃত চেহারাটির বর্ণনা দিতে ব্যার্থ হয়েছে। কারণ সিরিয়ার সবগুলো "অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্হী বিদ্রোহী" দলই যেকোনো অমুসলিম কে খুঁজে বের করে কতল করতে অথবা আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করতে ইসলামিক স্টেইটকে সহায়তা করে থাকে।

আসাদীয় সরকারের আমলে সিরিয়া একটি ও যাজকীয় রাষ্ট্র ছিল এবং জনগণ ধর্মের স্বাধীনতা ভোগ করেছে কিন্তু আসাদ বিরোধী সিরিয়ান সবগুলো দল এই অবস্থা মেনে নিতে পারেনি। আমেরিকা যে আসাদ বিরোধী ও ইসলামিক সশস্ত্র লড়াইয়ের পক্ষে তা আগের থেকে এখন আরও বেশি পরিস্কার ।

গতবছর অর্থাত ২০১৪ সালের ১৭ই এপ্রিলে লন্ডন রিভিউ অব বুক্সে একটি প্রতিবেদন করেছিল সেমুর হার্শ, সে জানিয়েছিল,২০১১ সালে ওবামা প্রশাসন এর লিবিয়ায় বোমা প্রচারাভিযান প্রকৃতপক্ষে, লিবিয়া থেকে সিরিয়ার আল-নুসরা ফ্রন্টকে স্যারিন গ্যাস সরবরাহ করার একটি বিরাট পরিকল্পনার অংশ ছিল, যার ফলে পরবর্তীতে সিরিয়ার নাগরিকদের উপর স্যারিন গ্যাস আক্রমন হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তাতে করে আসাদীয় সরকারকে দোষারোপ করা গিয়েছিল , এঘটনার ফলশ্রুতিতে আমেরিকার দেশটির উপর বোমা হামলা করার পথ সুগম হয়েছিল, যা ইতোপূর্বে ওবামা লিবিয়ায় সফলতার সাথে করতে পেরেছিল ।

আসাদ এবং গাদ্দাফি উভয় শাসকই রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে ,বিশেষ করে আসাদ রাশিয়ার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহের পরিবহন সড়ক সিরিয়ায়। ওবামার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সামরিক নীতি গুলো খেয়াল করলে দেখি তার শীর্ষ লক্ষ্য রাশিয়ার ক্ষতি সাধন করা এবং যে কোন উপায়ে হোক দেশটির সরকার বদল করার মাধ্যমে দেশটিকে করায়ত্ত করা । ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র আধিপত্যকে রাশিয়া সবসময় প্রতিহত করতে চেয়েছে কারন আমেরিকা রাশিয়াকে নিজের সাম্রাজ্যের অধীনস্ত করে নিয়ন্ত্রন করতে চায় ।

২০১১ সালে লিবিয়ায় আমেরিকার বোমা বর্ষণের আগপর্যন্ত দেশটিতে শান্তি ও সমৃদ্ধি দুটোই ছিল । আইএমএফ অনুযায়ী ২০১০ সালে মাথাপিছু জিডিপি ১২,৩৫৭.৮০ আমেরিকান ডলার ছিল, কিন্তু এটি ২০১১ সালে মাত্র ৫৮৩৯.৭০ আমেরিকান ডলারে নেমে যায়।

হিলারী ক্লিন্টনের লিবিয়ার বিষয়ে বিখ্যাত উক্তিটি ছিল:

আমরা আসলাম, আমরা দেখলাম, সে (গাদ্দাফী) মারা গেল।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ , এনপিআর এর প্রতিবেদক লেইলা ফ্যাদেল একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম দিয়েছিল " লিবিয়ার তেলক্ষেত্রগুলো আক্রমনের শিকার এবং লিবিয়ার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার" । সে লিবিয়ার জাতীয় তেল কর্পোরেশন এর চেয়ারম্যান মোস্তফা সানাল্লাহ এর সাথে কথা বলেছিল । সানাল্লাহ এর মতে দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ভাল নয় কারন তাদের উৎপাদনের হার ৮০ শতাংশ কমে গিয়েছে অর্থাৎ এতই কম যে, সহসাই অর্থনৈতিক ভাবে মাথা তুলে তারা দাড়াতে পারবেনা ।

অথচ, ওয়াশিংটনের নির্দেশ অনুযায়ী আইএমএফ ২০১১ সালের পর থেকে লিবিয়ার নির্ভরযোগ্যভাবে জিডিপি পরিসংখ্যান রিপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে ,কিন্তু সেখানে দেখানো হচ্ছে হুট করে ২০১২ সালে জিডিপি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে ( স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি- মাথা পিছু ১২,৫৮০.৫৫ আমেরিকান ডলার ) । কিন্তু সবাই জানে এই তথ্য ভুল এমনকি বিষয়টি নিয়ে এন পি আর রিপোর্ট পর্যন্ত করেছে ।

সিআইএ ২০১২ সালে জানিয়েছিল লিবিয়ার মাথাপিছু জিডিপি ( এর আগের বছরগুলোতে তারা কোন পরিসংখ্যান দেয়নি ) ২৩৯০০ আমেরিকান ডলার যা অতিহাস্যকর ছিল ,তারা বলেছে লিবিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা ঠিকঠাক আছে । আসলে পশ্চিমাদের কারো কথাই বিশ্বাসযোগ্য নয় । এবং পরবর্তীতে অর্থাত ২০১৪ সালের ২৩ জানুয়ারিতে এসে আটলান্টিক কাউন্সিল সত্যি কথাটি সহজ ভাবে বলার সাহস করেছে এই শিরোনাম দিয়ে যে "২০১৪ সালে এসে লিবিয়া ভয়াবহ অর্থনৈতিক পতনের স্বীকার " ।
বর্তমানে লিবিয়ার সংক্রান্ত সমস্যা এখন ইউরোপের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে । লক্ষ লক্ষ লিবিয়ান আজ বিশৃঙ্খল ভাবে তাদের আবাসস্থল ছেড়ে পালাচ্ছে । তাদের মধ্যে কেউ কেউ ভূমধ্য সাগর পার হয়ে দক্ষিন ইতালির উদ্বাস্তু ক্যাম্পে আশ্রয় নিচ্ছে, আর কেউ কেউ ইউরোপের নানা জায়গায় পালিয়ে রয়েছে ।

এখন আবার রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্ক রাখার কারনে সিরিয়ার উপর বিধ্বংসী হামলা চালানো হচ্ছে । এমনকি আমেরিকার নির্ভরযোগ্য সংবাদ সংস্থা নিউ ইয়র্ক টাইমস রিপোর্ট করেছে যে তুরস্ক ও সিরিয়া উভয় দেশের সরকার এবং বিদ্রোহীরা তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ কে পরাজিত দেখতে চায় । তাই রাশিয়া এর মিত্র বাশার আল-আসাদ কে সরানোর লক্ষ্যে ওবামা তুরস্কের নো ফ্লাই জোন তৈরি কে উৎসাহ দিয়েছে এবং তাদের বর্তমান কৌশল অনুযায়ী একটি ইসলামী সরকার দ্বারা আসাদীয় ধর্মনিরপেক্ষ সরকার কে প্রতিস্থাপন করাই আমারিকার মুল উদ্দেশ্য। আর ইসলামিক স্টেইট বিষয়টি শুধুই প্রচারনা মাত্র । বিশ্বের সাধারন জনগণ রাশিয়ার নয় বরং ইসলামিক স্টেইটের পতন নিয়ে বেশি আগ্রহি । কিন্তু এসব কিছুই আমেরিকার কাছে গুরুত্ব পূর্ণ বিষয় নয়, তার একমাত্র উদ্দেশ্য সাম্রাজ্য বিস্তার করা ,শুধু তার নিজস্ব সাম্রাজ্যকে আরও ফুলিয়ে ফাপিয়ে বিস্তার করা ।

একইভাবে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আলগা পর্দা লাগিয়ে ২০১৪ সালে ওবামা ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ এর মত নিরপেক্ষ সরকারকে উৎখাত করেছে । এবং আমেরিকা ইউক্রেইনে রাশিয়াবিরোধী- বর্নবাদী-নয়া ফ্যাসিস্টদের মদদ দিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করে রেখেছে।

আমেরিকা লিবিয়াকে আক্রমন করে ধ্বংস করার আগে দেশটি শান্তিতে ছিল তেমনি আমারিকা ও তুরস্ক যৌথভাবে সিরিয়াকে ধ্বংস করার আগে সেখানে শান্তি ছিল, আমেরিকা ইউক্রেইনে নাৎসি পুনুরুত্থানের ইতিহাস রচনা এবং সেখানে একটি জাতি নির্মূল করার অভিযান সংঘটিত করার আগ পর্যন্ত ইউক্রেইন ও শান্তিতেই ছিল ।

পূর্বে লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে উৎখাত, আসাদ উৎখাত এর বর্তমান প্রচেষ্টা, বা ইউক্রেনের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ এর সাম্প্রতিক সফল উৎখাত এসবের আসল লক্ষ্য একটাই আর তা হল রাশিয়ার সর্বনাশ করা। এখন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা রাশিয়াকে দমনে রাখার জন্যে তার আশপাশের দেশ গুলোতে নানান ঝামেলা করে চলেছে ,এবং আমেরিকা রাশিয়াকে পঙ্গু করে দিতে চায় জাতে সে পৃথিবীর 'একমাত্র অধিপতি' হতে পারে ।

অতএব আমেরিকান আন্তর্জাতিক কৌশলের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়- ' রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় ইউরোপীয় দেশগুলির অর্থনীতি ক্ষতি তেমন খারাপ কিছু নয় বরং তা ভালই ' !

খেলায় জেতার জন্যে সবসময় দুটি উপায় থাকে ,একটি হল অনুশীলন করে নিজের যোগ্যতা বাড়ানোর মাধ্যমে অন্যটি হল নিজেকে উন্নত না করে প্রতিযোগীকে দুর্বল করে দেওয়ার মাধ্যমে। আমেরিকা যে বর্তমানে দ্বিতীয় পন্থা অবলম্বন করছে এতে কোন সন্দেহ নেই ।

 

সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন উপর দৃষ্টিপাত

sco 2015

 

রাজীব আহমেদ (বাংলাদেশ)

সম্প্রতি রাশিয়ার উফায় অনুষ্ঠিত ১৫তম সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের (SCO) সভায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বেশকিছু সম্মতি পত্র সাক্ষর করেছে। যার ফলে ধারনা করা হচ্ছে এসসিওভুক্ত দেশগুলোর আগামী দশকের উন্নয়নের নীলনকশা এই চুক্তিগুলোর মাধ্যমে প্রণয়ন করা হলো।
এই নীলনকশায় অনেকগুলো দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক বহু বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। তার মধ্যে আগামী ১০ বছরের উন্নয়নের কৌশল, এসসিও কে আরো বিস্তৃত করা, নিরাপত্তা বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তা প্রদান এবং সমন্বয়করণ, এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফলকে তুলে ধরা। এবং এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঠিক মুল্যায়ন এবং তা প্রচারে আনার বিষয়টি এসসিও’র একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ যার কারনে এই সংগঠন এখন আন্তর্জাতিক ব্লক অংগনে এক বিশাল উচ্চতা পেল।

এসসিওর সদস্য দেশগুলো যেমন, চীন, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, রাশিয়া এবং উজবেকিস্তান ২০২৫ সাল পর্যন্ত এসসিও উন্নয়ন কৌশলপত্রের অনুমোদন দেয়। এই অনুমোদনের ফলে বিস্তারিত গবেষনার পর এই ব্লকের উন্নয়নের ধারাবাহিক ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও কর্মপন্থা নির্ধারন করা হবে যা আগামি ১০ বছরে এই ব্লকের উন্নয়নকে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের উন্নয়নের গতিপ্রকৃতির সাথে সমন্বয় করে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
এই কৌশলপত্রে আগামী দশবছর এসসিওভূক্ত দেশগুলোর মধ্যে রাজনীতি, নিরাপত্তা, ব্যবসা, অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহায়তা ও উৎসাহ জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, সদস্যরাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্ব এবং আস্থা বজায় রাখার জন্য অবিচল থাকবে, যেকোন নিরাপত্তার হুমকি একসাথে মোকাবেলা করবে, অর্থনৈতিক ও বাজার ব্যবস্থায় সহায়ক ভুমিকা রাখবে, প্রযুক্তি-স্বাস্থ্য-শিক্ষায় আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো একে অপরের সাথে কাজ করবে যাতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাব বিস্তার করা যায়। যদি অর্থনৈতিক বিষয়গুলোতে একে অপরের সাথে ঠিকমতো বোঝাপড়া হয় তবে আগামী দশকের এসসিও ব্লকের উন্নয়নের কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে।
চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং এর সাথে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠক কালে তারা উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছিলেন যে, চীনের সিল্ক রোড অর্থনৈতিক বেল্ট এর সাথে ইউরেশিয়ান ইকোনোমিক ইউনিয়নের সংযোগ ঘটাতে পারলে এই দুই দেশসহ অন্যান্য সদস্য দেশগুলো ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। এখানে উল্লেখ করা যায়, ২০১৩ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং ব্যবসা-বানিজ্য প্রসারের খাতিরে সিল্ক রোড উদ্যোগ গ্রহন করে।

এবারের এসসিও সভায় ভারত এবং পাকিস্তানকে অন্তর্ভূক্তির ব্যাপারে সবাই সম্মত হয়েছে এবং তাদের অন্তর্ভুক্তি প্রকৃয়াধীন ও সময়সাপেক্ষ। আর বেলারুশকে এবারের সভায় দর্শকের স্থান থেকে উন্নিত করে সংলাপে অংশীদারীত্ব দেয়া হয়েছে এছাড়াও এবছর সংলাপ-অংশীদার হিসাবে নেপাল, আজারবাইজান, আরমেনিয়া, কাম্বোডিয়াকে এসসিওতে নেয়া হয়েছে। সুতরাং এই ব্লক যে বিস্তৃত হচ্ছে এবং এই বিস্তার ইউরেশিয়া অঞ্চলকে আগামী দশকে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক নিরাপত্তার উন্নয়নের দিকে এগিয়ে চলছে তা বোঝা যাচ্ছে।

এবারের এসসিও সামিটে যে বিষয়গুলো বেশী আলোচিত হয়েছে তারমধ্যে নিরাপত্তার বিষয়টা অন্যতম। এসসিওভূক্ত দেশগুলো তাদের স্ব-স্ব দেশের সীমানায় নজরদারী কড়াকড়ি করবে। এছাড়া দেশগুলো একইসাথে তিন শয়তানকে মোকাবেলা করবে বলে জানিয়েছে। এই তিন শয়তান হলো সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং জঙ্গীবাদ। এদিকে তারা যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে মাদক উৎপাদন এবং এর চোরাচালান রোধেও প্রয়োজনে যৌথ ব্যবস্থা নেবে দেশগুলো। এসসিও মনে করে তাদের ভূমিকা জোরদার হলে পৃথিবীর বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা কমে আসবে এবং নিরাপদ হয়ে উঠবে।

এবছরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের ৭০ বছর পূর্ন হলো, এসসিও সদস্যরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে, যুদ্ধের ফলাফল তুলে ধরতে, ইতিহাস বিকৃতির বিরূদ্ধে সোচ্চার হতে এবং শহীদদের স্মরণ করতে বিশেষ কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। এসসিও মনে করে এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে ভবিষ্যত প্রজন্মকে একটি শান্তিপূর্ন পৃথিবী উপহার দেয়া সম্ভব। এক বিবৃতিতে এসসিও জানিয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বন্ধুত্ব এসসিও দেশগুলোকে অনুপ্রেরনা দেয় আর বর্তমান পৃথিবীর বাস্তবতায় এই বন্ধুত্ব কিছু নৈতিক দায়িত্ববোধ তৈরী করে যেখানে এই দেশগুলো এখনো ন্যায়বিচার এবং নিরাপত্তা নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা স্মরণে রেখে তারা জানিয়েছে, মানব অস্তিত্ত্ব হুমকির মুখে পড়বে এরকম যুদ্ধ বিগ্রহের মধ্য দিয়ে তারা আর যেতে চায়না, এসসিও মনেকরে ইউ এন চার্টারের মুলনীতিগুলো মেনে চললে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব।

 

আহা তেল!!

oil

লিখেছেন: ক্রিশ্টিয়ান রুজ *

 

ক্রিশ্টিয়ানা রুজ


কোনপ্রকার সম্মতি ছাড়াই যখন ইরান বৈঠকের সমাপ্তি ঘটছে তখন গ্রিস এবং চীন তাদের স্ব স্ব বাজারকে ঠান্ডা করতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তেলের দাম এসপ্তাহেও কম তবে একেবারে পড়ে যায়নি, এখনও ব্যারেল ৬০ ডলার করে বিক্রয় হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন সামনে আরও তেলের দামে উত্থান-পতনের সম্ভবনা রয়েছে।

এই সপ্তাহের শুরুতে যদিও কাঁচাতেলের বাজার বেশ খানিকটা পড়ে গিয়েছিল তবে এখন আবার একটু উঠে এসেছে। তেলের দাম ওঠানামার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে ইরানের পারমানবিক ইস্যুতে ভিয়েনা বৈঠক, গ্রিসের সাথে ইউরোপের বোঝাপড়া এবং চীনে শেয়ার বাজার পতন। এ অবস্থায় অবশ্য আমেরিকার তেল উত্তোলন কিছুটা বেড়েছিলো এবং তারা সরবরাহও বাড়াতে চায় যেখানে তাদের উত্তোলন গত ৬ মাসে তুলনামূলক কমে যাচ্ছিল।
কাঁচাতেলের দাম গত সপ্তাহে খুবই টালমাটাল ছিল তবে ইরান নিয়ে ভিয়েনা বৈঠক শেষ হওয়া, গ্রিস থেকে কিছু ইতিবাচক খবর আসার কারনে এবং চীনের শেয়ার বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার ঘটনাবলীতে তেলের দাম এখন একটু স্থির আছে।
বিশ্ব তেল বাজারের অংশীদাররা খুবই গভীরভাবে এই তিন আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো পর্যবেক্ষন করেছে। যদিও তেলের বাজারের দর ওঠানামার ক্ষেত্রে গ্রিসের গণভোটের প্রভাব কম, কিন্তু ইরান এবং চীন ইস্যুতে এই দর ওঠানামা সরাসরি ভূমিকা রাখে।
ইরানের পারমানবিক কর্মসূচী নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১২ সালে ইরানের তেল কেনার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। বর্তমানের ভিয়েনা আলোচনায় পারমানবিক কর্মসূচী সহ ইরান তার উপর আরোপকৃত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার আহ্বান জানায়। বর্তমানে ইরান প্রতিদিন ১.২ মিলিয়ন তেল রপ্তানী করে থাকে, নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে প্রায় দ্বিগুন অর্থাৎ প্রতিদিন ২.৩ মিলিয়ন তেল আন্তর্জাতিক বাজারে বেঁচতে পারবে।

অপরদিকে চীন বর্তমান বিশ্বের উত্তোলিত তেলের ১১% ব্যয় করে থাকে। বর্তমানে চীনে অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারনে তারা বার্ষিক ম্যাজিক জিডিপি কমে যাওয়ার আশংকার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। গত দশকে কাঁচাতেলের দাম বেশী থাকার একটা বড় কারন ছিল চীনে তেলের ক্রমবর্ধমান চাহিদা। এচাহিদা এখন বিভিন্ন আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রনহীনতার কারনে কমে যাচ্ছে, চীন এখন আর তেল ব্যবসার জন্য লাভজনক দেশ নয়।
অপরদিকে আমেরিকা তেল উত্তোলন বাড়িয়ে দিয়েছে, তারা গত দুই সপ্তাহে তাদের আগে থেকেই চলমান ৬৪০টি তেল উত্তোলক ড্রিলিং যন্ত্রের সাথে আরো ১২টি যন্ত্র বাড়িয়েছে। যেখানে গতবছরের ডিসেম্বরে প্রায় ৯২২ টি তেল উত্তোলক ড্রিলিং যন্ত্র তারা নিস্ক্রিয় করে রেখেছিল। এদিকে আমেরিকা গত আশি বছরের মজুতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী কাঁচাতেল তারা মজুত করে রেখেছে। তাদের ৪৬৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুদ করাও তেলের দাম নিম্নমূখী হওয়ার একটা কারন।
এখন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারনে এবং সেইসাথে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধির কারনে তেলের দাম কমে গেলেও যদি কোন বড় অর্থনীতির দেশ তাদের অর্থনৈতিক বিকাশ পুনরূদ্ধার করে ফেলে তখন সেই দেশে তেলের চাহিদা বাড়লে পুরো আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দাম বৃদ্ধি পাবে। তবে তেলমূল্য ওঠানামার আরেক বড় কারন হলো, ওপেক এখন আন্তর্জাতিক বাজারের কাঁচাতেলের মূ্ল্য নিয়ন্ত্রন ও নির্ধারন করতে তার প্রভাব হারিয়েছে।

Leave a Reply